প্রেম মানেনা জাতপাত



বিশ্বম্ভর বাবুর মনটা আজ অত্যন্ত খারাপ। ছেলে নিলয়ের সাথে তার বিয়ের ব্যাপার নিয়ে রুষ্ট আচরণ করে ঘর থেকে বের করে দিয়েছেন। নিজের এতো আদরের একমাত্র ছেলেকে এভাবে তাড়িয়ে দিয়ে তিনি অত্যন্ত অনুতপ্ত। শুয়ে শুয়ে তার অতীত জীবন স্মৃতিচারণ করে দু'চোখে জ্বালা শুরু হয়ে গেল। তাঁর মনে পড়লো এই ছেলেকে মানুষ করার জন্য তিনি কি না করেছেন। 
তখন তিনি সামান্য এক স্কুল শিক্ষক। ছেলে নিলয়ের জন্মের তিন বছর পর স্ত্রী আর বড় দুই মেয়ে রীমা ও ঝুমাকে নিয়ে শহরের ভাড়া ঘরে এসেছিলেন। উদ্দেশ্য একটাই ছিল ছেলেকে পড়িয়ে মানুষ করা। মেয়ে দুটোকে সরকারি স্কুলে পড়ালেও ছেলেকে প্রাইভেট স্কুলে ভর্তি করে তিনজন গৃহ শিক্ষক রেখে পড়িয়েছেন। মাস পুরার আগেই বেতনের যে সামান্য কটা টাকা শেষ হয়ে যেতো। তখন তিনি নিজে খরচ যোগাতে টিউশন আরম্ভ করেন। স্কুলের ডিউটির ফাঁকে সকাল বিকেল টিউশনি করে ছেলের পড়ার খরচ যুগিয়েছেন। তার স্বপ্ন ছিল ছেলেকে পড়িয়ে ডাক্তার বানানোর। কিন্তু তার সে স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল। শেষ পর্যন্ত কলেজে বি এ ক্লাসে ভর্তি করেন। 
আজ দু'বছর হলো বি এ পাশ করেও সরকারি চাকরির কোন সুবিধা করতে না পারায় একটা প্রাইভেট স্কুলে দশ হাজার টাকা বেতনে নিয়োগ করেন। এতদিন তো মোটামোটি ভালোই চলছিল। তিনি ঘুনাক্ষরেও জানতেন না যে কলেজে পড়াকালীন সময়ে সে দিয়া নামক একটা মেয়েকে ভালোবেসেছিল আর তাকেই সে বিয়ে করতে চায়। বিশ্বম্ভর বাবুর মনে পড়লো একবার এই দিয়ার বাবার সাথে তার ঝগড়া হয়েছিল। তখন সে ছিল এক পানের দোকানদার। কোন এক মামুলি ব্যাপারে দিয়ার বাবা সেদিন যে ব্যবহার করেছে, আজ পর্যন্ত বিশ্বম্ভর বাবু তা ভুলতে পারেননি। পাশের বাড়ির লোক হলে কি হলো বংশ  পরম্পরায় ওরা নীচ জাতি, তাছাড়া এদের বংশে শিক্ষাদীক্ষা বলে কিছু নেই। আর বিশেষ করে এই মেয়ে দিয়া বার বার পরীক্ষায় বসেও বি এ পাশ করতে পারেনি। 
আজ যখন নিলয় মায়ের কাছে বিয়ের ব্যাপারে কথা বলে তখন মা বিনীতা দেবী বিশ্বম্ভর বাবুকে তাতে রাজি করানোর চেষ্টা করেন। তিনি আগেও দু-তিন বার এ ব্যাপারে উনার সাথে কথা বলেছেন কিন্তু বিশ্বম্ভর বাবু তাতে কোন দিনও কর্ণপাত করেননি। আজ আবার একথা উত্থাপন করতেই তিনি অগ্নিশর্মা হয়ে উঠেন। তার সোজা বক্তব্য হল,' চির শত্রু আর নীচ জাতির মেয়েকে আমি বৌ বানিয়ে ঘরে তুলতে পারব না।' তখন নিলয় বাবার মুখের উপর বলে উঠলো,' দিয়াকে আমি ভালোবাসি। আর ভালোবাসায় কোন জাতপাত ধর্মের বিচার থাকে না। তাছাড়া উনি তোমার শত্রু হলেও দিয়া তো কোন দোষ করে নাই।' নিজের কথার উপর ছেলের এহেন আচরণ সহ্য করতে না পেরে বিশ্বম্ভর বাবু গালিগালাজ করে ছেলেকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দেন আর বলেন,' দিয়াকে বিয়ে করে ঘরজামাই হয়ে যাও। আর কোন দিন আমি তোমার মুখ দেখতে চাই না।' মা নিলয়কে অনেক করে বুঝালেন তবু সে রাতের অন্ধকারে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
      এদিকে দিয়ার বাবা সুজিত দাশ মেয়েকে খুশি করতে নিলয়ের সাথে তাকে বিয়ে দিয়ে ঘরজামাই করে রাখতে রাজি হয়ে গেলেন। পরদিন কালীবাড়িতে দিয়ার মা-বাবা, তার কাকু ও অন্যান্য অনেকের উপস্থিতিতে নিলয় ও দিয়ার বিবাহ সম্পন্ন হয়। 
বিবাহের পর প্রথম কয়েক মাস খুব ভালোই চলল। তারপর ঘরজামাই হলে যা হয় তাই শুরু হল। সারাদিন গাধার মত খাটুনি, তারপরও দিয়ার ভাই তাকে সহ্য করতে পারে না। কথায় কথায় ভুল ধরে আর ঝগড়া করে। ইতিমধ্যে দিয়াও অসুস্থ হয়ে পড়ে। কয়েকদিন পর নার্সিং হোমে তার একটা কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। দিয়ার বাবা ঋণ করে নার্সিং হোমের টাকা পরিশোধ করে তাদের বাড়িতে নিয়ে আসেন। 
    নিলয় প্রাইভেট স্কুল থেকে যে সামান্য বেতন পায় তা দিয়ে সংসার খরচ যোগাতে পারে না। তার উপর সেই ঋণের বোঝা। কথায় কথায় দিয়ার ভাই যা তা দুর্ব্যবহার করে। ওদিকে দিয়ার গগনচুম্বী উচ্চাকাঙ্ক্ষা। এখন কথায় কথায় দিয়াও তার সাথে ঝগড়া করে। অসহায়ের মত সে নিরবে হয়তো সবকিছু সহ্য করে নিত। কিন্তু আজ যখন গালিগালাজ করতে করতে দিয়ার ভাই বলে উঠলো,' তোমার কি কোন মানসম্মান আছে? এরকম ঘরজামাই হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো। ' নিলয় আত্মবিস্মৃত হল। আজ সে বুঝতে পারল ঘরজামাই হওয়ার পরিণতি।
    সেদিন অতিষ্ঠ হয়ে ঝগড়া করে সে সবকিছু ত্যাগ করে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। প্রথমে নির্লজ্জের মত বাবার বাড়িতে গিয়েছিল। মা তাকে দেখে সব কিছু শুনে বিশ্বম্ভর বাবুর কাছে পুত্রের হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে তাকে বাড়িতে আশ্রয় দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু বাবা অগ্নিশর্মা হয়ে বললেন ,'  এমন অবাধ্য কুলাঙ্গার ছেলের আমার প্রয়োজন নেই। তাকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দিলেন। অগত্যা বাধ্য হয়ে সে ঘর থেকে আবার বেরিয়ে গেল। কিন্তু সে কোথায় যাবে কি করবে ভেবে পাচ্ছিল না। দুচোখে ঝাপসা দেখতে লাগলো। বারবার সেই ' অবাধ্য কুলাঙ্গার ' কথাটা তার কানে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। চোখের জল মুছতে মুছতে সে নিজে নিজে ভাবতে লাগল,' দিয়াকে ভালোবেসে বিয়ে করে সে তো কোন অন্যায় করেনি। দিয়ার বাবা তো খুশি হয়েই তাদের বিয়ে দিয়ে ঘরজামাই করে নিয়েছেন। তাহলে কি ঘরজামাই হলে এমনি দুরবস্থা হয়?' ভাবতে ভাবতে উদ্দেশ্যহীন ভাবে সে রেলস্টেশনের দিকে যাত্রা শুরু করলো স্থির করলো রাতের ট্রেনে কোথাও চলে যাবে।
এদিকে নিলয় চলে যাবার পর স্বামীর প্রতি এমন রূঢ় আচরণের জন্য দিয়াও তার ভাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া করে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। নিলয়ের বাড়ির অদূরে পৌঁছে একজন লোককে জিজ্ঞেস করে সে জানতে পারল এইমাত্র নিলয় বাবার সাথে ঝগড়া করে রেলস্টেশনের দিকে গিয়েছে। দিয়া দেরি না করে পেছনে পেছনে ছুটে চলে। স্টেশনে পৌঁছে দূর থেকে নিলয়কে দেখে দিয়া চিৎকার করে ডাকতে শুরু করে,' নিলয় নিলয়।' নিলয় ঘুরে দাঁড়াতে দিয়া তার কাছে ক্ষমা চেয়ে বলল,' নিলয় আমাকে ক্ষমা করে দাও, আমি তোমার প্রতি অনেক ভুল করেছি। আর একথা ভুলে গেলে চলবে না যে আমরা একে অপরকে ভালোবেসে বিয়ে করেছি। শত বাধা বিপত্তি সত্বেও আমাদের ভালোবাসার জয় হয়েছে। এ জীবনটা তোমার একার নয় বরং আমরা দু'জনের। তুমি যেথা যাও, আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাও।' নিলয় দিয়ার কোল থেকে শিশুকে নিয়ে জড়িয়ে ধরে বলল, জাতপাত উঁচুনিচু এসব ধুয়ে মুছে চলো আমরা রাতের ট্রেনে বেঙ্গালুরু চলে যাই। শুনেছি সেখানে কাজের কোন অভাব নেই। ঘরজামাই কলঙ্ক নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে কাজ করে খাবো। আমাদের  ভালোবাসার ফসল এই কোলের শিশুকে জাতপাতের ঊর্ধ্বে রেখে মানুষ করার চেষ্টায় আমরা বেঁচে থাকবো।'

( রচনা কাল:১১/০৮/২০২৪)

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বন্ধু মানে আলোর দিশা

লুটছে যত রাজভাণ্ডারী

বিদায়