অসতর্কতার জন্য



অপরিচিত একটা নাম্বার থেকে ফোন পেয়ে সেদিন সারারাত জামরুলের ঘুম হয়নি। রাত তখন এগারোটা। ইচ্ছে হয়েছিল এসময়েই ছুটে গিয়ে মেয়েকে ঘরে নিয়ে আসেন। কিন্তু এত রাতে গাড়িই বা কোথায় পাবেন। তাছাড়া গরীবির সাথে লড়াই করা জামরুল খুব ভালোই জানেন এই মুহূর্তে প্রাইভেট গাড়ি করে শহরে এতদূর মেয়েকে আনতে গেলে যা ভাড়া দিতে হবে তা ম্যানেজ করা সম্ভব নয়। তাই স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিলেন রাত্রি প্রভাত হলে ট্রেন ধরে চলে যাবেন। এর মধ্যে দু-তিন বার মেয়েকে ফোন করেছেন কিন্তু মেয়ে ফোন উঠায় নি। একটা অজানা আতঙ্ক আর দুশ্চিন্তা তাকে গ্রাস করে নেয়। 
এরই মধ্যে সেই অচেনা নাম্বার থেকে তার মোবাইলে একটা ভিডিও আসে। যা দেখে তার শ্বাস রুদ্ধ হওয়ার উপক্রম। তিনি সঙ্গে সঙ্গে ঐ অজানা নাম্বারে ফোন করেন। ওপাশ থেকে আওয়াজ এলো,' মেয়ে কোথায় আছে, ওকে জিজ্ঞেস করুন।' ইতিমধ্যে তার স্ত্রীও ঘুমিয়ে পড়েছেন। কারো কাছে বলার কিছু নেই। রাগে ক্ষোভে দুঃখে নিজেকে নিজেই শেষ করে দেওয়ার ইচ্ছা হয় জামরুলের। অনেক ধৈর্য্য ধরে সারারাত এপাশ ওপাশ করে জামরুল আরো এক দুর্ভাবনায় পড়ে গেলেন। মেয়েটা তো ফোন উঠাচ্ছে না, শেষ কালে কি---। 
ভাবতে ভাবতে তার দুচোখে জ্বালা শুরু হয়ে গেল। মেয়ের ভবিষ্যত নিয়ে তার স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেল। তার মনে পড়লো এই তো সেদিন মেয়ের কলেজে ভর্তি নিয়ে কত আনন্দ কত উত্তেজনা। নিজে কাঠমিস্ত্রির কাজ করে চারজনের সংসার চালিয়ে যেতে তাকে কত হিমসিম খেতে হয়। তবুও মেয়ে মেট্রিকে সাতাত্তর শতাংশ মার্ক নিয়ে পাশ করায় তিনি অনেক বড়ো স্বপ্ন দেখেছিলেন আর সে স্বপ্ন সফল করতে মেয়েকে শহরের নামী দামী প্রাইভেট কলেজে ভর্তি করেছেন এজন্য তাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা ঋণ ও করতে হয়েছে। তদুপরি প্রাইভেট হোস্টেলে মাসে আরো আট দশ হাজার টাকা করে দিতে হয়। তাহলে কি এসব বেকার হয়ে গেল? তাহলে মেয়ের পড়ার কি এখানেই ইতি টানতে হবে ? মেয়েকে শহরে ভর্তি করার সময় অনেকেই অনেক রকম সমালোচনা করেছে। কেউ কেউ তো এমনও বলেছে ,' বেটা চ্যাটায়ে শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখছে। নিজের খাবার জোটাতে পারছে না আর মেয়েকে ডাক্তার বানানোর স্বপ্ন দেখছে।' জামরুল মোবাইলে মেয়ের কীর্তি দেখছে আর চোখের জল ফেলছে। নিজের চোখকে সে বিশ্বাস করতে পারছে না। তার এতো আদরের মেয়ে, যাকে সে নিজের চেয়েও বেশি বিশ্বাস করত। যাকে নিয়ে সে সবসময় গর্ব অনুভব করতো। জামরুল বারবার ভিডিও দেখছে আর ভাবছে ছেলেমেয়ে কি মা-বাবার বিশ্বাসে এতোই আঘাত করতে পারে? সত্যিই যদি এরকম হয় তাহলে গায়ে মুখ দেখাবে কেমন করে।' 
  ভোর হতেই জামরুল স্ত্রীকে নিয়ে রওয়ানা হলেন। আধ ঘণ্টা পায়ে হাঁটার পর রেল স্টেশন। সকাল ছয়টায় তারা রেলে উঠে যাত্রা শুরু করে। মাত্র দেড় ঘন্টার রাস্তা। এরপর তারা মেয়ের হোস্টেলে পৌঁছে যায়। সেখানে গিয়ে মেয়েকে জিজ্ঞেস করলে সে সবকিছু অস্বীকার করে। ঠিক তখনই তার কলেজ থেকে বাবার কাছে ফোন আসে অফিসে গিয়ে দেখা করার জন্য। একটু পরেই বাবা অফিসে গিয়ে অধ্যক্ষের সাথে দেখা করে যা শুনলেন তা এরকম---
     প্রায় দু-তিন মাস থেকে তাদের মেয়ে মিলি প্রায়ই ক্লাশ ফাঁকি দিয়ে আসছে। যার কারণে বিগত দুতিনটে পরীক্ষায় ফল অত্যন্ত খারাপ করেছে। যে কথাটা তাকে আগেই জানানো হয়েছে। তখন তিনি তার মেয়েকে জিজ্ঞেস করলে সে তখন অস্বীকার করে। পরীক্ষার ফল খারাপের কারণ জিজ্ঞেস করলে সে তখন কোন সদুত্তর দিতে পারেনি।
কলেজ অধ্যক্ষ আজ জামরুলকে ঐ দিনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলতে বাধ্য হন যে প্রত্যেক মা-বাবাই নিজের ছেলেমেয়েদের উপর অগাধ বিশ্বাস রাখেন। আর এই অন্ধভাবে অগাধ বিশ্বাসই শেষ পর্যন্ত ছেলে মেয়ের জীবন নষ্ট হওয়ার কারণ হয়ে ওঠে। তাঁর মতে ঐ সময় জামরুল যদি একটু সতর্ক হতেন আর মেয়ের কথায় বিশ্বাস না করে ব্যাপারটা একটু ঘেঁটে দেখতেন তাহলে তাকে আজ এদিনের মুখ দেখতে হতো না। তিনি আরো বলেন,' আজকাল মোবাইল আর টেকনোলজি এতো এ্যাডভান্স হয়েছে যে যখন তখন মানুষের কর্ম কান্ড সব রেকর্ডিং হয়ে যায় কেউ টেরই পায়না। অসতর্ক মুহুর্তে কে কোথায় ফেঁসে যাবেন কেউ বলতে পারবে না। ফলে প্রত্যেক মানুষকে এব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন, তিনি জানতে পেরেছেন যে তার মেয়ে কোন এক ছেলের সাথে স্কুল ফাঁকি দিয়ে পার্কে গিয়ে আড্ডা দেয়। যার ফলে সে এরকমই একটা ঘটনার শিকার হয়েছে। কাজেই তিনি যেন এখন তার মেয়েকে বাড়িতে নিয়ে যান।' 
জামরুল অন্যান্য আরও দু একজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারেন যে তাদের গ্রামেরই এক ছেলে জাকির যে নাকি রফিকের সাথে মিলির মেলামেশা সহ্য করতে পারে না। তাই তাদের অজান্তে সে রফিক ও মিলির পার্কে নিবিড় হওয়ার দৃশ্য এবং কথাবার্তা মোবাইলে ভিডিও রেকর্ডিং করে। অনেক দিন থেকেই সে এভাবে তাদের গতিবিধি লক্ষ্য করে আসছে এবং সুযোগ বুঝে তাদের মেলামেশা ক্যামেরা বন্দী করে। সেদিন কলেজের সামনে এই ভিডিও রেকর্ডিং দেখিয়ে মিলিকে ব্ল্যাকমেল করতে চায় আর ওখানেই ঘটনার সূত্রপাত। 
জাকির ভয় দেখিয়ে মিলির সঙ্গে প্রেম করতে চায় এবং কথা না মানলে সে ফটো এবং ভিডিও গুলো সর্বত্র ছড়িয়ে দিবে বলে হুমকি দেয়। তখন মিলি তার প্রেমিক রফিককে সবকিছুই খুলে বলে। তা শুনে রফিক জাকিরকে শায়েস্তা করতে মিলিকে পরামর্শ দেয়। সূযোগ বুঝে মিলি আগপিছ না ভেবে জাকিরকে খুব বেশি গালাগাল করে এমনকি চপ্পল হাতে নিয়ে আঘাত করতে উদ্যত হয়। চিৎকার ও কথা কাটাকাটি শুনে সেখানে অনেক লোক জড়ো হয়। আর রফিক নিজের ভুল ঢাকতে এই ঘটনা মোবাইলে রেকর্ডিং শুরু করে। খোলা রাস্তায় এহেন ঘটনায় জাকির অত্যন্ত লজ্জিত হয়ে প্রতিশোধ নিতে মিলি ও রফিকের মেলামেশার দৃশ্যাবলী সঙ্গীসাথী ও অন্যান্য অনেকের মোবাইলে পাঠিয়ে দেয়। যা গতরাতে মিলির বাবার মোবাইলেও পাঠানো হয়। ঘটনার সম্পূর্ণ বর্ণনা শুনে জামরুল লজ্জায় মাথানত করে কলেজ ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে আসেন এবং মেয়েকে  বাড়িতে নিয়ে যান। মিলি কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে অনেক কান্নাকাটি করে। সে বুঝতে পারে তার জীবনে অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। সে বুঝতে পারলো তার কারণে বাবা আজ সমাজে লাঞ্চিত ও অপমানিত। কিন্তু তখন আর করার কি আছে? দিশেহারা হয়ে সে রফিককে ফোন করে ওর সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। রফিক উল্টে জবাব দেয়,' তোমার জন্য আমি কি আমার জীবন নষ্ট করে দেবো?' 
কথা শুনে মিলি মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় সে এ জীবনটা আর রাখবে না। বাড়িতে গিয়ে বাবা শুধু একটি কথাই বললেন,' বড় সখ করে মেয়েকে শহরে পড়তে দিয়েছিলাম। নিজের অসতর্কতার জন্য আমার সব স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেল।'

( রচনাকাল ০২/০২/২০২৩)

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বন্ধু মানে আলোর দিশা

লুটছে যত রাজভাণ্ডারী

বিদায়