মানুষই ভুত



সে অনেক আগের কথা। দুই বন্ধু মিলে শহরে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম। দু'জন ই  দুটো সাইকেল নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু সিনেমা শেষ হওয়ার পর যখন বাড়িতে ফিরবো তখন সে বন্ধুকে আর খুঁজে পেলাম না। ওকে খুঁজে না পেয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম। ছোট বেলা থেকেই আমি একটু সাহসী ছিলাম। যদিও সিনেমার কাহিনীটি ছিল সম্পূর্ণ ভূতের তবুও আমি এসব ভূতটুত বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু সে স্থান থেকে বাড়ি প্রায় দশ বারো কিলোমিটার হবে। তার উপর ঘোর অন্ধকার রাত। অনেকক্ষণ খোঁজাখুঁজি করেও বন্ধুকে যখন পেলাম না তখন নিরুপায় হয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। একা এই অন্ধকার রাতে এতদূর যাবো তার উপর আবার গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। ওদিকে আবার বেশি দেরি হলে বাড়িতে গিয়ে মার খেতে হবে। তাই এই অন্ধকার আর বৃষ্টি উপেক্ষা করে সাইকেল চালাতে শুরু করলাম। শহরতলী অতিক্রম করে গ্রামীণ মেঠোপথ, তার দুধারে ধানক্ষেত। সময়টা কার্তিক মাসের শেষ দিকে। কোথাও কোন সাড়াশব্দ নেই। আরো কিছুদূর যেতেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি আর বাতাসের ঝাপটায় পুরো নাকাল অবস্থা। এমন সময় সামনে ধানক্ষেতের মধ্য থেকে একটা গুঙ্গানীর শব্দ কানে এলো। তখন মনে একটু ভয় হলো, একটু সময় থামলাম। সামনে এগিয়ে যাবো না পেছনে ফিরে যাবো ঠিক করতে পারছিলাম না। সিনেমায় দেখা সেই ভূতটা বুঝি আমার সামনে। আবার সেই হুঁ হুঁ শব্দ, তারপর আবার ধানক্ষেতের মধ্যে চিৎকার করে অস্পষ্ট স্বরে কান্নার আওয়াজ,' ওরে বাবারে, মরে গেলামরে, বাঁচাও।' তার সঙ্গে আবার টুং টাঙৃ শব্দ। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে অনুমান করতে লাগলাম কী ব্যাপার। কি জানি একটা অজানা ভয়ে আমার সমস্ত শরীর ঘামতে লাগলো। পেছনে ফিরে যাবো চিন্তা করে ঘুরতেই দেখি কেউ একজন ভূ---ভূ--বলে চিৎকার করে পালাচ্ছে। ভাবলাম আর কোন উপায় নেই, আমি ভুতের পাল্লায় পড়ে গেছি। উভয় দিকে বিপদ দেখে সাহস সঞ্চয় করার চেষ্টা করলাম এবং চোখ বন্ধ করে ঈশ্বরের নাম নিয়ে সামনের দিকে খুব দ্রুত সাইকেল নিয়ে এগিয়ে গেলাম। সেই বিপদসংকুল স্থান পেরিয়ে এসে হঠাৎ মনে হল ভূত হলে তো এতক্ষণে আমার ঘাড় মটকে দিত। এটা ভূত নাকি কোন মানুষ কোন দুর্ঘটনায় পড়লো! আবার একটু থেমে চিন্তায় পড়ে গেলাম। আমার বিবেক আমাকে চলে যেতে বারণ করলো। এবার সাহস সঞ্চয় করে সেই শব্দটা বুঝার চেষ্টা করতে করতে একটু এগিয়ে গেলাম । গিয়ে দেখি আমার ধারণাই ঠিক। একজন বৃদ্ধ লোক ধানের মধ্যে পড়ে কাতরাচ্ছে, আর তার উপরে সাইকেল। হাত পা ছুড়ে সাইকেলের নীচে থেকে উঠার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে কিন্তু উঠতে পারছে না। মনে হলো ওর পা' টা ভেঙে গেছে আর মাথায়ও আঘাত পেয়েছে। চিৎকার করতে করতে ওর দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম। আমি দ্রুত গিয়ে উপর থেকে সাইকেলটি সরিয়ে ওকে ধরে তুললাম। বেচারা কাতরাতে কাতরাতে আমাকে বলল,' আমি বাজার থেকে সাইকেল নিয়ে আসছিলাম, একটা বাইক আরোহী আমাকে ধাক্কা দিয়ে ধানক্ষেতের মধ্যে ফেলে দিয়ে চলে গেল। আমি বাঁচলাম না মরলার মানুষটা একবারও ফিরে দেখল না।' বৃদ্ধ লোকটি আমার হাতে কাঁধে ভর করে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেই চলল,' বাবা, তুমি না আসলে হয়তো আমি আর বাচতাম না।' আমি তখন আমার ভয়ের কথা বললাম,' আমি তো ভূত মনে করে ভয়ে পালাচ্ছিলাম। ভাগ্যিস আমি হঠাৎ কি মনে করে ফিরে আসায় আপনাকে উদ্ধার করতে পারলাম।' বৃদ্ধ লোকটি তখন বলল,' না বাবা, ভুত বলে কিছু নেই। আসলে মানুষই ভূত। ঐযে লোকটা আমাকে ধাক্কা মেরে ফেলে চলে গেল ওরা মানুষ রূপি জানোয়ার, ওরাই ভূত।'

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বন্ধু মানে আলোর দিশা

লুটছে যত রাজভাণ্ডারী

বিদায়