ফেরিওয়ালা



সাতসকালে প্রাতঃভ্রমন সেরে ফেরার পথে রাস্তার পাশে অনেক লোক জমায়েত দেখে কৌতূহলী হয়ে একটু এগিয়ে গেলাম। পাশে গিয়ে দেখলাম একটা ফেরিওয়ালা কে কয়েকটা ছেলে মারধর করছে আর পাশে ওর জিনিস পত্র তছনছ করে দিয়েছে। ভীড়ের মধ্যে একটু সাহস করে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, ও নাকি ছেলে ধরা। একটা ছয় সাত বছরের মেয়েকে নাকি একটা পুতুল দিয়ে ফুঁসলিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথে ওরা ধরে ফেলে আর এজন্যই এই জটলা আর মারপিট। ব্যাপারটা বুঝার জন্য আরো একটু জিজ্ঞেস করতেই এক মহিলা এগিয়ে এসে বলল তার মেয়েকে নাকি এই পুতুলটা দিয়ে মন ভুলিয়ে নিয়ে যেতে চাচ্ছিল অমনি মহিলা সেখানে উপস্থিত হয়ে চিৎকার করাতে লোকজন উপস্থিত হয়ে মেয়েটাকে রক্ষা করে। মেয়েটি তখনও হাতে পুতুল নিয়ে খুশিতে খেলছিল। ব্যাপারটা আমার কাছে অন্যরকম লাগলো। ওদের একটু শান্ত হওয়ার কথা বলে ফেরিওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম ওর বাড়ি কোথায় এবং আসল ব্যাপারটা কি। তখন ফেরিওয়ালা ভয়ে কাচুমাচু হয়ে আমাকে তার পরিচয় পত্র দেখাল। দেখলাম লোকটার নাম সরল। ওর বাড়ি কলকাতার বারাসাতে। আমি জিজ্ঞেস করাতে সে বলল,"  দু-তিন জন মেয়েলোক আমাকে থামিয়ে কিছু জিনিস পত্র কিনেছে। সেসময় এই ছোট্ট মেয়েটি একটি পুতুল কেনার জন্য আব্দার করে কাঁদতে শুরু করে। মা পয়সা নেই বলে ওকে টেনে নিয়ে যেতে চাইলে সে আরও জোরে কান্না শুরু করে দেখে আমার কেন জানি একটু দয়া হল। আমার মনে হলো বাড়িতে ওর মত একটা মেয়ে রেখে এসেছি। তাই ওকে নিজের সন্তানের মতো মনে করে ওকে পুতুলটা আমি দিয়েছি। শিশু তো শিশুই, শিশু ভগবানের রূপ। পুতুলটি দেওয়া মাত্রই সে খুব খুশি হয়ে ওটা নিয়ে খেলতে শুরু করে। বিশ্বাস করুন স্যার ওর খুশি দেখে আমার চোখে জল এসে গেছে। আমি ওর হাতে আরও দুটি চকলেট দিতেই ওর মা এসে ' কুচি ধরা কুচি ধরা' বলে চিৎকার শুরু করে। আর অমনি লোকজন জড়ো হয়ে আমার সমস্ত জিনিস পত্র তছনছ করে দিয়েছে।' এতটুকু বলেই লোকটি কান্নায় ভেঙে পড়ে। আমি ওকে একটু শান্তনা দিয়ে আরো কয়েকজনের সাথে পরামর্শ করে ওকে জটলা থেকে মুক্ত করে পাঠালাম।
বেচারা এই ঘটনায় এতটুকুই কৃতজ্ঞ হলো যে এরপর থেকে যখনই দেখা হয় আমার সঙ্গে দু একটি কথা বলে যায়।
 #####
   প্রায় এক বছর পরের ঘটনা। একদিন সন্ধ্যায় দেখি সেই ফেরিওয়ালা কিছু ফলমূল নিয়ে আমার বাড়িতে উপস্থিত। জিজ্ঞেস করলাম ' কি হে সরল কেমন আছো।' সে বলল 'স্যার ঈশ্বরের কৃপায় ভালোই আছি। আপনাদের আশীর্বাদ আর ভাগ্য ভালো থাকায় আজ একটা দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেছি।' চেয়ে দেখি ওর মাথায় আর হাতে ব্যান্ডেজ করা। জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে? সে বলল,' স্যার ঈশ্বর যা করেন ভালোর জন্যই করেন। আজ ঐ শিশুটাকে একটা মালবাহী ট্রাকের এ্যাকসিডেন্ট থেকে বাঁচালাম। আমি না থাকলে নির্ঘাত ট্রাকটি ওকে পিষে ফেলত। তাই ভাবলাম আপনাকে খবরটা দিয়ে যাই। ' আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম,কোন শিশুর কথা বলছো? সে বলল,' স্যার ঐ যে একদিন ছেলে ধরা বলে আমাকে মেরেছিল আর আপনি আমাকে বাঁচিয়ে ছিলেন। ঐ যে একটি মেয়ে ---!'  আমার মনে পড়লো। বললাম, ও আচ্ছা তারপর? সে সকরুণ কণ্ঠে আবার বললো,' স্যার, আজ আমি ঐ পথে আসার সময় সেই শিশুটাকেই একটা এ্যাকসিডেন্ট থেকে বাঁচাতে গিয়ে আমার এই অবস্থা।' কথা বলতে বলতে ওর দু'চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। একটু থেমে আবার বলল,' স্যার ট্রাকের চাপা থেকে শিশু টাকে তো বাঁচিয়েছি কিন্তু পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য একটি অটো গাড়িতে ধাক্কা খেয়ে আমার এই অবস্থা।' 
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ওর মা-বাবা কেউ কি ওখানে এসেছিলেন , ওরা কি বললেন? তোমার ওষুধ পত্তর খায় খরচা  কিছু কি দিয়েছেন? 
সে বলল,' না স্যার, কি ই বা দেবেন , ওরা বড়লোক। নিজের মেয়ের জীবন ফিরে পেয়ে ওরা খুশি। আমার মতো একটা ফেরিওয়ালা পথে পড়ে মরে গেলেও কার কি যায় আসে? 
একজন লোককে শুধু বলতে শুনেছি,' এই সেই ফেরিওয়ালা যাকে একদিন ছেলে ধরা বলে খুব মারধর করা হয়েছিল, বেচারা! নিয়তির কি পরিহাস, আজ আবার সে ই মেয়েটির জীবন দান করেছে। যদি পারেন ওকে একটু সাহায্য করুন।' 'কিন্তু কে কার কথা শোনে। ভাগ্যিস অন্য একজন ফেরিওয়ালা সে সময় সে পথে আসছিল। সে ই আমাকে পাশের হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ব্যান্ডেজ করিয়েছে। সেখানে ডাক্তার বলেছেন একটা এক্সরে করে নিতে।' 
আমি বললাম, হ্যাঁ, তা তো করতে হবে। তুমি বরং এক্সরে করে আরো ভালো একজন ডাক্তার দেখাও। এতটুকু বলে আমি ওর হাতে একটা পাঁচশ টাকার নোট বের করে দিতে গেলে সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। বলল,' স্যার টাকা লাগবে না। বরং আমার জন্য দোয়া করবেন। আর যদি পারেন তো আমাদের মতো ফেরিওয়ালা দের ছেলে ধরার অভিযোগ থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করবেন।'

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বন্ধু মানে আলোর দিশা

লুটছে যত রাজভাণ্ডারী

বিদায়