বাবারা যে রকম হয়
লতিফুল ইসলামের মনটা আজ খুব খারাপ। মেয়ে ফোন করেছে ওর শরীরটা ভালো না, ওর জন্যে যেন দোয়া করেন। তিনি বলেছিলেন দেখতে যাবেন কিন্তু মেয়ে বারন করেছে। এর অনেক কারণও আছে। নিজ চোখে হয়তো মেয়ের কষ্ট দেখলে বাবা মনে আঘাত পাবেন এজন্য মেয়ে চায় না বাবা তার বাড়িতে আসুন। শুয়ে শুয়ে লতিফুলের মনে পড়লো তার একমাত্র মেয়ে, ঘরের প্রদীপ সানিয়ার অতীত সোনালী দিনগুলোর কথা। যাকে নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন ছিল। ছোট বেলা থেকেই অনেক আদর যত্ন করে মানুষ করে তুলেছেন। ইসলামী শিক্ষা, সাংসারিক রীতিনীতি, কাজকর্ম আচার ব্যবহার কোন গুণ ছিল না তার। পড়াশোনাতেও অত্যন্ত মেধাবী ছিল। উচ্চ মাধ্যমিকে আশি শতাংশ মার্ক নিয়ে পাশ করার পর মেয়ের ইচ্ছা ছিল ডাক্তারি পড়বে। কিন্তু এই অজপাড়া গাঁয়ে থেকে সে প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব না। কারণ তার জন্য ভালো কোচিং এর প্রয়োজন। আর তা করতে হলে বড়ো শহরে যেতে হবে। তার অভাবের সংসার। তাছাড়া মেয়েকে একা ছাড়া সম্ভব না। আদরের মেয়ে, এক মুহুর্ত ওকে ছাড়া তিনি থাকতে পারবেন না। তাই তাকে নিজের পাশে রেখে জেনারেল পড়াশোনা করিয়েছেন। এক মুহুর্ত চোখের আড়াল হলে মেয়েও সহ্য করতে পারে না। বাবা বাজারে গেলে বার বার মাকে বলতো ,' বাবা আসছে না কেন। এত দেরী কেন বাবাকে ফোন কর, কোন অসুবিধা হলো কি না।' মা সাজেদা অনেক সময় কঠোর হয়ে বলতেন,' এত আদর যত্ন ঠিক নয়, একদিন তো ওকে বিয়ে দিতে হবে। বাবা বলতেন,' আমি আমার লক্ষী মেয়েকে বিয়ে দেব না।' কিন্তু যা সত্য তা তো মেনে নিতে হবে। সাজেদা পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে মেয়েকে গৃহস্থালির সমস্ত কাজকর্ম শিখিয়েছেন। ঘরদোর ঝাড়ামুছা থেকে শুরু করে রান্না বান্না, কিচেন গার্ডেনে সবজি ফলানো, ফুলের বাগান দেখা শোনা করা যাবতীয়। মা সবসময় বলতেন,' সহনশীলতা আর ধৈর্য গুণ প্রত্যেক মেয়েদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।' তাদের অভাবের সংসারে সানিয়া মায়ের জীবন ধারণের লড়াই নিজের চোখে দেখেছে আর সেও সেভাবেই যোগ্য মেয়ে হিসেবে গড়ে উঠেছে।
লতিফুলের মনে পড়লো যেদিন তার মেয়েকে দেখতে আসেন, বেয়াই আর বেয়াইন তাদের ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে। সেদিন তার মুখ থেকে কোন কথাই বেরোচ্ছিল না। মেয়ের বিয়ের কথা ভাবতে তার শ্বাস রুদ্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। তখন বেয়াই আর বেয়াইন একবাক্যে বলেছিলেন,' ছেলে ব্যঙ্ক ম্যানেজার। আমাদের ওখানে আল্লাহর দেয়া টাকা পয়সা, কাজের লোকের কোন অভাব নেই। মেয়ে আমাদের পছন্দ হয়েছে, আর ওকে আমরা নিজের মেয়ে হিসেবে নিতে চাই। শুধু মাত্র ছেলের একটু সঙ্গ দেওয়ার জন্য। আর আমরা ওকে নিজের মেয়ের মতোই রাখব। ওর নিজের গ্লাসের জলটুকু পর্যন্ত নিজেকে ঢালতে হবে না।' সানিয়া তখনই জানতো, মেয়ে দেখতে এসে সব শ্বশুর বাড়ির লোকজন এরকম কথাই বলে থাকেন।
মেয়ের ফোন পাওয়ার পর থেকে লতিফুলের ভাবনার শেষ নেই। সে বুঝতে পারলো নিশ্চয়ই মেয়ের উপর ওরা অত্যাচার করেছে। বিয়ের প্রায় তিন বছর হয়ে গেছে। প্রথম প্রথম সানিয়া এসে মা-বাবার কাছে অভিযোগ করত,' রান্না বান্না, কাপড় কাচা থেকে শুরু করে বাড়ির যাবতীয় কাজ তাকেই করতে হয়। তাতে তার কোন দুঃখ নেই। কিন্তু উঠতে বসতে খোঁটা দেওয়া আর মা-বাবার নামে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ তার সহ্য হয় না। মা-বাবা বেড়াতে গেলে কতকিছু নিয়ে যান তবুও নানা রকম খোঁচা কথা তাকে সহ্য করতে হয়। অনেক দিন তো এমনও হয়েছে সবার সামনেই তাদের অপমানিত হয়ে ফিরে আসতে হয়েছে। এতসব ভাবতে ভাবতে লতিফুলের দুচোখে জ্বালা শুরু হয়। সেদিন সারারাত তার ঘুম হয়নি। স্থির করলেন কালই মেয়েকে দেখতে যাবেন।
পরদিন সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে কাজকর্ম শেষ করে মেয়ের বাড়ি রওয়ানা দিলেন। মেয়ে টক দই খুব পছন্দ করে তাই কিছু ফলমূল ও এক কিলো দই নিয়ে দুপুরের দিকে সেখানে গিয়ে হাজির হলেন।
বাবাকে দেখা মাত্র সানিয়ার মন খারাপ হয়ে গেল। তবু বাবাকে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভিতরে নিয়ে গেল। বাবা হাত বাড়িয়ে ব্যাগটা দিয়ে বললেন,' এই নে, তোর জন্য টক দই এনেছি। সে বলল,' বাবা বসুন, আমি চা করছি।' তাদের কথা শুনে পাশের রুম থেকে শাশুড়ি জিজ্ঞেস করলেন,' কে এসেছে বৌমা?' একটু উঁকি মেরে দেখে ফিরে যাচ্ছিলেন এমন সময় বাবা তাকে দেখে বললেন,' কেমন আছেন বেয়াইন সাব।' শাশুড়ি বাবার কথার কোন উত্তর না দিয়ে সরে পড়লেন।
বাবার বাড়ির কেউ আসলে এবাড়ির কেউ খুশি না হয়ে বরং বিরক্তই হন বেশি। সানিয়া তা খুব ভালোই জানে, ওর মা-বাবাও জানেন।
চা করতে করতে সানিয়া ভাবে, সারাজীবন বাবাকে সে যেভাবে দেখেছে এখন তিনি যেন তার বিপরীত। এত অপমানিত হয়েও কেন যে এখানে বার বার আসেন। সে চা দিয়ে বলল,' এই নিন বাবা। চা পান করে পাশের রুমে বিশ্রাম নিন। আমি রান্না বান্না করি। দুপুরের খাবার খেয়ে যাবেন।' বাবা শুকনো হাসি হেসে বললেন,' আমি তো ভাবছিলাম একদিন থেকে তোর স্বামীর সাথে কথা বলে একটু এদিক সেদিক ঘুরে দেখে যাবো। তা, তোর শ্বশুর মশাই কই রে, উনাকে তো দেখতে পাচ্ছি না!'
সানিয়া বলল,' না বাবা, তোমার থেকে লাভ নেই। তাছাড়া বাড়িতে তো মা একা আছেন।' কথা কটি শেষ করে সানিয়া শাড়ির আঁচলে মুখ ঢেকে রান্না ঘরে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল। বাবাকে বলার মতো কিছু নেই কারণ সে দেখেছে, এই মাত্র তার শ্বশুর তার বাবাকে দেখেও না দেখার ভান করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছেন। একটা মেয়ে কতো অসহায় হলে এরকম করতে পারে তা একমাত্র সানিয়ার মতো মেয়েরাই জানে।
সব দুঃখ বুকে চেপে রেখে সানিয়া শাশুড়িকে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,' মা, বাবার জন্য কি রান্না করব?'
শাশুড়ি চট করে জবাব দিলেন,' এখানে আসলেই কি খেয়ে যেতে হয়? খাওয়াতেই যদি হয়, যা আছে তা দিয়ে খাইয়ে আপদ বিদেয় কর।' কথাটা একটু উচ্চ স্বরে বললেন যা লতিফুলের কর্ণ কুহরে বিষময় হয়ে গিয়ে পৌঁছল। সানিয়া আবার শাশুড়িকে বলল,' মা, ফ্রিজে তো মাছ মাংস সবই আছে। না হয় একটু ডিম সিদ্ধ করে নেই?' কথাকটি শেষ হতে না হতেই শাশুড়ির অগ্নি চক্ষু দেখে সানিয়া রান্না ঘরে চলে গেল। শাশুড়ি পেছন পেছন গিয়ে বললেন,' দুদিন পর পর আসার দরকার কি? আর এত মেহমানদারির কি আছে? চা' টা খেয়েছেন তো, তবু ঐ ডাল ভাত যা আছে তা দিয়ে না হয় খাইয়ে দাও।' সে বলল,' সকালের মাছের তরকারি আছে, তাতে দু-তিন পিছ মাছ আছে।' মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে শাশুড়ি অগ্নিশর্মা হয়ে বললেন,' না ওটা তো তোর শ্বশুরের জন্য রাখতে হবে। রাতে পেটে অসুখ থাকায় উনি মাছ খাননি। তাছাড়া যে দুজন লোক কাজ করছে তারা কি দিয়ে খাবে। মান সম্মান বলে কথা।
অগত্যা বাধ্য হয়ে সানিয়া বাবাকে ডাল আর শুধু তরকারি দিয়ে খাইয়ে দিল। বাবা খেতে বসে খুব তারিফ করতে করতে খাওয়া শেষ করে যেন তৃপ্তির ঢেকুর দিলেন। বললেন,' মা তোর হাতের রান্না বেশ ভালো। আজ অনেক দিন পর পেটভরে ভাত খেলাম।' সানিয়া মনের দুঃখ মনেই চেপে রেখে বলল,' হঠাৎ করে আপনি এসেছেন, ঘরে কিছুই নেই। রাতের রান্না তরকারি, তাও মাছ শেষ হয়ে গেছে।' বাবা ও মেয়ের মাঝখানে এই যে ছলনার অভিনয় তা তারা দুজন ছাড়া আরও একজন হয়তো অন্তরীক্ষে থেকে লক্ষ্য করেছেন।
সানিয়া বাবাকে একরকম জোর করে বিদায় করে দিল। বাবা সবকিছু বুঝে একবার বলেছিলেন তাকে নিয়ে যাবেন কিন্তু সে রাজি হয়নি। কারণ সে জানে শাশুড়ি তাকে যেতে দিবেন না। বাবাকে বিদায় দিতে গিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে শুধু একটি কথাই বলল,' বাবা, তুমি কেমন করে এমন গুণের অধিকারী হলে? সব বাবারাই কি এরকম হয় বাবা?'
বাবা ওর মাথায় হাত দিয়ে হাসিমুখে বললেন,' হে মা, আমি ভালোই আছি। সব বাবাই আমার মতো। সব বাবাই মেয়ে বিয়ে দেওয়ার আগে নির্লজ্জতার ট্রেনিং দিতে হয়। তুই মনে কোনো দুঃখ আনিস না মা।' কথা কটি শেষ করে হাসতে হাসতে বাবা চলে গেলেন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন