ভালোবাসাই পরম প্রাপ্তি



সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রমের পর বাড়িতে এসে আবার শাশুড়ির বকুনি খেতে খেতে নিজের জীবনের উপর বিতশ্রদ্ধ রিমি, কি করবে ভেবে উঠতে পারছিল না। একদিকে অফিসের হাড়ভাঙা খাটুনি তার উপর কোলের শিশু আর অসুস্থ শাশুড়িকে নিয়ে সংসারের সমস্ত কাজকর্ম রান্নাবান্নায় অতিষ্ঠ হয়ে এক এক সময় মনে হয় আর বেঁচে থেকে লাভ কি? 
   সেদিন অফিস থেকে ঘরে ফিরতেই শাশুড়ির ঝাঁঝালো সুর কানে এলো," এই হাড় কাঁপানো শিশুকে নিয়ে আমি আর পারছি না। একে সঙ্গে নিয়ে অফিসে যেয়ো আর না হয় অন্য কোন ব্যবস্থা কর। আমাকে বরং একটা হাতি কিনে দিলে রাখতে পারব কিন্তু একে রাখা আমার দ্বারা সম্ভব না।" রিমি নিরবে সব সহ্য করে। রাতে ফোনে রোহনের সাথে এ বিষয়ে কথা বলল। কিন্তু তাতে কোন লাভ হল না। সে বলল," তোমার বেতন আছে, টাকার তো অভাব নেই। তবে অসুবিধা হবে কেন?" স্বামী রোহনের কাছে টাকাই সব। নিজ ব্যবসা নিয়ে সে এতটাই ব্যস্ত যে ফোনে কথা বলার সময়ও সে পায় না। ব্যবসা নিয়ে কখন কোথায় যায় তারও কোন নিশ্চয়তা নেই। মাঝে মধ্যে বাড়িতে আসলে কারণে অকারণে কথা কাটাকাটি আর অশান্তি। রিমি নিজের কোন কথারই মূল্য পায় না। 
এদিকে অফিসের সব সহকর্মী জেনে গেছে রিমির বিবাহিত জীবনের অশান্তির কথা। রিমি যে রোহনকে নিয়ে কোন অবস্থাতেই সুখি নয় একথা বুঝতে পেরে বড়বাবু কবীর তার সাথে প্রেমের ফাঁদ পাতে আর বেচারি রিমি নিজের অজান্তেই কবীরের জালে ফেঁসে যায়। সে নতুন ভাবে কবীরকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখে। অল্প দিনেই কবীরের ভালোবাসায় সে এতটাই বিভোর হয়ে গেল যে নিজ পেটের সন্তানের স্নেহ মমতা ভুলে গেল। 
রিমি নতুন করে ঘর বাঁধার প্রস্তুতি নিচ্ছে একথা তার চালচলন আর ফোনালাপে শাশুড়ি বুঝতে পারলেন। তিনি ছেলেকে ফোন করে আরজেণ্ট ডেকে পাঠালেন। দুদিন পর ছেলে বাড়িতে এলে মা তাকে খুব তিরস্কার করলেন এবং নিজ সন্তানের ভবিষ্যৎ ও মানসম্মানের দোহাই দিয়ে ছেলেকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। তিনি বললেন," রিমির চালচলনটা খুব ভালো না। আমি যতটুকু বুঝতে পারছি, আমার সোনার সংসার তছনছ হয়ে যাচ্ছে। আর এরজন্য তুমিই দায়ী। রিমির তো কোন দোষ নেই। ওর জায়গায় যে কোন মেয়ে হলে এমনটা করবে, এটাই স্বাভাবিক। বিয়ের পর থেকে সে তার স্বাভাবিক প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই তুমি আর টাকার পেছনে না ছুটে স্ত্রী সন্তানকে একটু সময় দাও। বৌমা যেটুকু বেতন পায় তা দিয়ে তোমাদের সংসার সুখে সাচ্ছন্দে চলে যাবে। আমি আর কদিন আছি, তোমার সংসার তুমিই সামলাও। এমন উশৃঙ্খল সন্তানকে নিয়ে বৌমা কিভাবে সংসারের সব কাজকর্ম করে অফিস সামলাবে। তাছাড়া তুমি তো বাড়িতে বসে যে কোন ব্যবসা করতে পারো, ঘরের পাশে একটা দোকান খুলে তো বসতে পার। তাতে নিজের সন্তানকেও মানুষ করতে পারবে আর রিমিও শান্তি পাবে।" 
রোহন ইতিমধ্যে এব্যাপারটা কোন এক সঙ্গীর ফোন পেয়ে জেনে গেছে। তাই সে দ্বিরুক্তি না করে মাকে আশ্বস্ত করে বলল," তাই হবে মা। আমার চোখ আজ খুলে গেছে। সত্যিই আমি রিমির প্রতি অনেক অবিচার করেছি। এমন ভুল আর করবো না।" কথা গুলো দরজার আড়াল থেকে রিমি এতক্ষণ শুনছিল। এবার সে সামনে বেরিয়ে এসে-- "ভাগ্যিস মা, আপনি আমাকেও অনেক বড় ভুল থেকে বাঁচালেন।" বলে এগিয়ে গিয়ে রোহনকে জড়িয়ে ধরে বলল,"হে গো, সত্যিই তো আমাদের কিসের অভাব? আমি তো কোন দিনও তোমার কাছে কিছু চাইনি , শুধু তুমি আমাদের পাশেই থেকো। একজন নারীর কাছে স্বামীর ভালোবাসাই পরম প্রাপ্তি।" রোহন নিজের ভুল বুঝতে পারল। তার দু'চোখ দিয়ে  গড়িয়ে পড়লো ভালোবাসার অশ্রু ধারা। মা'ও শাড়ির আঁচল দিয়ে দুচোখ মুছতে লাগলেন।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বন্ধু মানে আলোর দিশা

লুটছে যত রাজভাণ্ডারী

বিদায়